অর্ণব আর মেঘলার পরিচয় হয়েছিল ফেসবুকে। প্রথমে সাধারণ বন্ধুত্ব, তারপর ধীরে ধীরে দুজনের মধ্যে ভালোবাসা তৈরি হয়।
প্রায় এক বছর ধরে তাদের সম্পর্ক চলছিল।
সমস্যা ছিল একটাই।
তারা কখনও সামনাসামনি দেখা করেনি।
মেঘলা সবসময় কোনো না কোনো অজুহাত দিত।
কখনও বলত সে অসুস্থ, কখনও বলত বাড়ির সমস্যা।
অর্ণব রাগ করলেও শেষ পর্যন্ত মেঘলার কথায় গলে যেত।
কারণ মেয়েটা তাকে সত্যিই ভালোবাসত।
অন্তত তার তাই মনে হতো।
প্রতিদিন রাত ১২টার পরে তাদের কথা হতো।
ভিডিও কল নয়।
শুধু মেসেজ।
মেঘলা বলত,
"তোমার কণ্ঠ শুনলে আমার কষ্ট হয়। তাই শুধু মেসেজ করি।"
অর্ণব ব্যাপারটা অদ্ভুত মনে করলেও জোর করত না।
একদিন হঠাৎ মেঘলা লিখল,
"আমি যদি হঠাৎ হারিয়ে যাই, তুমি কি আমাকে খুঁজবে?"
অর্ণব হেসে উত্তর দিল,
"পৃথিবীর শেষ প্রান্ত পর্যন্ত খুঁজব।"
কিন্তু মেঘলা আর কোনো উত্তর দিল না।
সেদিনের পর থেকে তার ফোন বন্ধ।
মেসেজের রিপ্লাই নেই।
ফেসবুক অ্যাকাউন্টও উধাও।
এক সপ্তাহ কেটে গেল।
অর্ণব পাগলের মতো খুঁজতে লাগল।
অবশেষে অনেক কষ্টে মেঘলার এক পুরনো বন্ধুর খোঁজ পেল।
তার সঙ্গে যোগাযোগ করতেই লোকটা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
"তুমি কি মেঘলাকে সত্যিই চিনতে?"
অর্ণব অবাক হয়ে বলল,
"মানে?"
লোকটা একটা পুরনো খবরের লিংক পাঠাল।
অর্ণব খুলে দেখল।
চার বছর আগের খবর।
একটি মেয়ে ট্রেন দুর্ঘটনায় মারা গেছে।
মেয়েটির নাম—
মেঘলা সেন।
অর্ণবের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে বারবার ছবিটার দিকে তাকাতে লাগল।
এটা সেই মেয়েই।
যার সঙ্গে সে এক বছর ধরে কথা বলছে।
সেই রাতে অর্ণব ঘুমাতে পারল না।
রাত ঠিক ১২টায় তার ফোনে একটা নোটিফিকেশন এল।
অজানা নম্বর।
একটা মাত্র মেসেজ।
"আমাকে খুঁজছিলে?"
অর্ণবের হাত কাঁপতে শুরু করল।
সে উত্তর দিল,
"তুমি কে?"
কয়েক সেকেন্ড পর রিপ্লাই এল।
"যাকে পৃথিবীর শেষ প্রান্ত পর্যন্ত খুঁজতে চেয়েছিলে।"
অর্ণব ফোনটা ফেলে দিল।
কিন্তু তারপরও মেসেজ আসতে লাগল।
একটার পর একটা।
শেষ মেসেজে শুধু একটা ছবি ছিল।
একটা পুরনো রেললাইন।
আর সেখানে সাদা পোশাক পরা একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
মুখ দেখা যাচ্ছে না।
ছবির নিচে লেখা—
"একবার দেখা করবে না?"
পরের দিন অর্ণব সেই জায়গায় গেল।
কেন গেল, সে নিজেও জানত না।
হয়তো ভালোবাসা।
হয়তো কৌতূহল।
হয়তো দুটোই।
সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল।
রেললাইনের পাশে দাঁড়িয়ে সে চারদিকে তাকাচ্ছিল।
ঠিক তখনই পিছন থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল।
"তুমি এসেছো..."
অর্ণব ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল।
সাদা পোশাকে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
মেঘলা।
একই মুখ।
একই হাসি।
চোখে জল নিয়ে সে বলল,
"আমি জানতাম তুমি আসবে।"
অর্ণব কিছু বলতে পারছিল না।
মেঘলা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলল,
"আমি শুধু একবার দেখতে চেয়েছিলাম, সত্যিই কেউ আমাকে এতটা ভালোবাসতে পারে কিনা।"
তারপর সে মৃদু হেসে বলল,
"এবার আমার যেতে হবে।"
অর্ণব হাত বাড়িয়ে তাকে ছুঁতে গেল।
কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে মেয়েটা কুয়াশার মতো মিলিয়ে গেল।
শুধু বাতাসে ভেসে রইল তার শেষ কথাটা—
"সব ভালোবাসার শেষ একসাথে হওয়া নয়, কিছু ভালোবাসা শুধু মনে থেকে যায়..."
আজও প্রতি বছর সেই দিনে অর্ণব ওই রেললাইনের পাশে একটা সাদা গোলাপ রেখে আসে।
আর আশ্চর্যের বিষয়—
পরদিন সকালে গোলাপটা আর সেখানে থাকে না।
গল্পটি পড়ে কেমন লাগল? কমেন্টে জানান। আর পরেরবার প্রেম, রহস্য আর ভয়ের মিশেলে আরও গল্প পড়তে চাইলে অবশ্যই জানাবেন।